ট্রাভেল ব্লগঃ চন্দ্রনাথ অভিযান!


IMG_20180525_164611
চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে ভিউ

‘ঘুরতে চলো, ঘুরতে চলো’- একটু ভ্রমণ পিপাসু বউ হলে এই ঘ্যান ঘ্যান কানের কাছে লেগেই থাকবে।এছাড়াও আছে- ‘তুমি আমাকে কোথাও ঘুরতে নিয়া যাওনা’; যদিও আপনি তাকে নিয়ে দেশের বাইরে নিদেনপক্ষে ইন্ডিয়া হলেও গ্যাছেন। যাক সেসব কথা।পরিবার মানেই হয়তো এই গঞ্জনা। তা অফিসের ব্যস্ততা, এই ঝামেলা সেই ঝামেলা বলে আর কত পার পাওয়া যায়! রোজায় পুরো একটা মাস ছুটি। বউ তখন দুর্গার মত দশভুজা না হলেও অক্টোপাসের মত অষ্টভুজা হয়ে পাকড়াও করে ফেলে- ‘এবার যাবা কই?’! কথাটা যেমন হুমকিও বোঝায় আবার কই ঘুরতে যাবো সেটা জানতে চাওয়াও বুঝায়। যাই হোক- মোগলের হাতে পরলে খানা না খেয়ে উপায় নাই! এবার গরীব মন ভাবতে থাকে, কোথায় গেলে কম খরচে সাময়িক শান্তিস্থাপন হতে পারে। ছোটভাই আছে চট্টগ্রামে, সেখানে গেলে থাকার খরচ নেই। আর চট্টগ্রামের মত সৌন্দর্য বাংলাদেশের আর কোথায়ই বা আছে!! সাথে ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু কক্সেসবাজারে কম দামে একটা থ্রি-স্টার হোটেল ম্যানেজ করে দিলো। পুরো হীরে জহরত হাতে পাওয়ার চেয়ে কম কিসে! এবার দু্গ্গা, দু্গ্গা বলে বেড়িয়ে পড়লেই হয়।


ব্যাচেলর লাইফের ওই এক শান্তি। ব্যাক-প্যাকটা কাঁধে ফেলে বেড়িয়ে পড়লেই হয়। ক্লাস করতে যাচ্ছি, না সাত-সমুদ্র তেরো নদী পেড়িয়ে ট্যুরে যাচ্ছি- কারও সাধ্য নেই বোঝার। কিন্তু বিবাহিত জীবনে তো তার আর বালাই নেই। মানুষ না গেলেও লাগেজ গোটা দুই যাবেই। আর যদি মোটামুটি দিন দশেকের ট্যুর হয়- তাহলে আর পায় কে! তখন মিডিয়াম সাইজের ট্রলি কেন কেনা হয়েছে, তার কৈফিয়ত দিতে দিতে জেরবার হওয়ার জোগাড় হয়।
প্ল্যান হচ্ছে, খুলনা থেকে বাসে ঢাকা, সেখান থেকে রাতের ট্রেনে টিকেট করা আছে। ভোর নাগাদ চট্টগ্রামে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ওইদিন রেস্ট নিয়ে তার পর দিন বেরুবো তেমনই প্ল্যান। মে মাসের শেষের দিক। হালকা বৃষ্টি-কাঁদা মেখে কমলাপুর গিয়ে বসে রইলাম ট্রেন ছাড়ার বেশ খানিক্ষন আগেই। এর মধ্যে ঢাকা নেমে একটু টি এস সি ঘুরে গিয়েছিলাম। ক্লান্তিকর অপেক্ষা শেষে ট্রেন যখন ছাড়ল তখন আরেক বিপত্তি। ঝিরঝিরে বৃষ্টির রাতে এসি কামরায় একটু শীতই করছিলো। এর মধ্যে আমাদের পিছনে এক কাপল বসেছে। তা বসেছে ভালো। কিন্তু কিছু কিছু কাপলের- বিশেষ করে অবিবাহিত হলেই বোধহয়, তাদের একটু বেশিই গরম লাগে। তারা ওই ঠাণ্ডার মধ্যেও ফ্যান ছেড়ে রাখবেন। অনুরোধ করে দু-একবার বন্ধ করালাম, কিন্তু সুইচ তাদের হাতের কাছে- বন্ধ করে কি আর বেশিক্ষণ রাখা যায়!!


একেবারে ভোরে চট্টগ্রাম নামলাম। স্টেশন থেকে ভার্সিটি অনেক দূর!শাটল এর অপেক্ষায় থাকা যেত, কিন্তু প্রচণ্ড ক্লান্তি সেদিকে আর যেতে দিলোনা। সিএনজি নিয়ে চললাম, আমার অন্যতম প্রিয় একটা ক্যাম্পাসের দিকে। আমাদের ওখানের বাসাটা ভার্সিটির একেবারে লাগোয়া। ফাঁকা রাস্তায় খুব তাড়াতড়ি পৌঁছে গেলাম। ছোটভাই নাশতা এনে খাওয়ালো বাইরে থেকে। খেয়েই একটা ঘুম দিলাম……এক ঘুমে একেবারে বিকেল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


সন্ধ্যের সময় ভার্সিটি ঘুরলাম। ছোটভাইয়ের বন্ধু বান্ধবদের সার্কেল নিয়ে খুব ভালো একটা সময় কাটালাম। নির্জন, ভৌতিক, প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের পাশে বসে অর্ধ জোছনায় অপটু গলার রবীন্দ্র সঙ্গীত কি যে মাদকতা ছড়ায় তা আমি ওইদিনের আগে জানতাম না। পুকুরটার ঠিক ওপারেই অথৈ বন।ঘন ঝোপের ভেতরে দানবের মত মাথা উঁচু করে আছে নাম না জানা অসংখ্য গাছ। জোছনার আলোয় সেই আধি-ভৌতিক মায়াবী অনুভূতির বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। ওখানে না থাকলে কিছুতেই বোঝা যাবেনা সেই অনুভূতি।

অনেক রাতে বাসায় ফিরে এলাম। কাল ভোরেই বেরিয়ে পরবো। মিরসরাই এর মহামায়া লেকে কায়াকিং করার খায়েশটা ছিল, সাথে খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখবো তেমনই ইচ্ছা ছিল। লোকাল পাবলিক ট্রান্সপোর্টের প্রতি আমার আজীবন বিতৃষ্ণা। তাই প্ল্যান করলাম ভাটিয়ারী গিয়ে ওখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করবো। সি এন জি করে ভাটিয়ারী যাওয়ার রাস্তাটা যে কি সুন্দর তা না দেখলে বিশ্বাস হয়না। রাস্তার দু ধার যে দৃশ্য সুধা পান করাবে তা নিয়ে বেঁচে থাকা যায় অনন্তকাল।
গাড়ি ছুটছে মীরেরসরাই এর উদ্দেশ্যে। মহামায়া লেকে যেতে খুব বেশি সময় লাগলোনা। লেক এবং লেক সংলগ্ন ছোট ছট পাহাড়- এক মায়াবী পরিবেশ। তখন বেলা কম হয়নি। মাথার উপরে গনগনে সূর্য। তাও যেন মনে প্রাণে পর্যটক হয়ে গেছি- যা দেখি তাই ভালো লাগে। ঘোড়া-ঘুড়ি আর অবশ্যই কিছু ছবি তোলার পরে কায়াকিং করলাম মহামায়ার শান্ত জলে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে এরই মধ্যে। খৈয়া ছড়া যাওয়ার প্ল্যান। পেটেও ছুঁচোর কেত্তন শুরু হয়ে গেছে। বেরিয়ে পরলাম লেক থেকে। বাইরে এসে হালকা কিছু খাওয়া দাওয়া করলাম। রোজার দিন তাই প্রায় সব দোকান বন্ধ। কলা-কেক ইত্যাদিই কিছুটা হলেও চাগাড় দেয়া খিদে নিবৃত করলো।

মহামায়া লেক
মহামায়া লেকে কায়াকিং


টুইস্ট শুরু হলো এর পরে। গাড়ি চলতেই ড্রাইভার আমাদের বলতে লাগলো, তার কাজ পরে গেছে, আর তাছাড়া খৈয়া ছড়া ঝর্ণা মূল রাস্তা থেকে অনেক দূরে- হ্যান ত্যান। বুঝলাম ঝর্ণা মিস হয়ে যাবে। তাই ইনস্ট্যান্ট প্ল্যান করলাম, সীতাকুণ্ডে নেমে চন্দ্রনাথের মন্দির দেখবো আমরা, গাড়ি ওয়ালা আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে যাক। যেই ভাবা সেই কাজ, নামলাম সীতাকুন্ডু- চন্দ্রনাথ পাহাড়ের নীচে। গাড়ি ছেড়ে দিলাম।
পাহাড়ের নীচে একটা ব্রিজ ভাঙ্গা। তার মেরামত চলছে, তাই কিছুটা আগেই নামতে হল। আমাদের চন্দ্রনাথ সম্পর্কে তেমন ধারনা নেই। ধারনা ছিল, মন্দির আশে পাশেই- আশে পাশে অনেক মন্দির অবশ্য আছেও। সেগুলো দেখতে দেখতে একটু একটু করে উঠছি। কেউ কেউ বলছে, এখন উঠলে তো সন্ধ্যের আগে নামতে পারবেন না, কেউ বলছে এইতো- বেশি উপরে না- উঠে যান। কিছুটা কনফিউজড হয়ে গেলাম। তখন চিন্তা করলাম, উঠতে থাকি- কিছুদূর উঠে নেমে যাবো।নীচের দিকে অত উঁচু রাস্তা না……হাঁটছি……মাঝে একটা দোকানে হালকা নাশতা করলাম। তারাও বলল, পারবেন, উঠতে থাকুন। ওখান থেকে বেরিয়ে সামনে আগাচ্ছি…যত সামনে যাচ্ছি, লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে……বেশ কিছুদূর গিয়ে একটা ছোট দোকান দেখলাম। ওখানে তার বললো, লাঠি ছাড়া উঠতে পারবেন না। ১০ টাকা করে লাঠি ভাড়া নিলাম, তিনজনে তিনটা। যাওয়ার সময় লাঠি দোকানে আবার দিয়ে যেতে হবে।আবার সামনে আগাচ্ছি……আর ভাবছি, একটু পরেই নেমে যাবো……

ওইতো মন্দির দেখা যাচ্ছে
যাত্রা শুরু


খুলনা থেকে এত বড় জার্নির ধাক্কা, তার উপরে এই গরমে মহামায়া লেকে এনার্জি প্রায় শেষ করে এসেছি, তার উপরে সারাদিনে খাওয়া হয়নি কিছুই- সবচেয়ে বড় কথা মন্দির কত উঁচুতে তাও জানিনা। আগাচ্ছি আর ভাবছি না পারলে সাথে সাথে নেমে যাবো। তখন দেখা হল, মন্দির ফেরত এক ভদ্রলোকের সাথে। তিনি মন্দিরে পুজো দিয়ে নামছেন। আমাদের প্রসাদ দিলেন। তারপরে তিনিও বললেন, একটু দূর আছে, কিন্তু পারবেন। তবে সামনে একটা ঝর্ণা আছে, সেখান দিয়ে বাম দিক দিয়ে ঊঠবেন। আর নামার সময় ডান দিক দিয়ে নামবেন। উনি এই কথাটা বলে যে আমাদের কী উপকার করেছিলেন, তা পরে খুব ভালো মত বুঝতে পেরেছিলাম।
তিনজন আমরা। আমার ছোটভাই তো লাঠি নিয়ে হনহন করে উঠে যাচ্ছেন আগে আগে। আমি পারছিনা, কারণ বউ খুব একটা দ্রুত আগাতে পারছেনা। আমি তাকে সাথে নিয়ে উঠতে গিয়ে কিছুটা পিছিয়ে পরছি। ঝর্নার সামনে দিয়ে বামে উঠলাম। কোথাও কেউ নেই। মাঝে মাঝে পাখির ডাক, আর হঠাত হঠাত হুট করে দুই একজন লোকের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। জিরিয়ে জিরিয়ে উঠছি। আর ভয়ও লাগছে। এইসব পাহাড়ি লোক যদি হাতের দা টা গলায় ধরে তাহলে? কিন্তু সাধারণ পাহাড়িরা এসব করেনা বলেই জানি, এবং ভয় পেলেও উঠছি। সাথে খুব বেশি জল নেইনি। যা নিয়েছিলাম তাও প্রায় শেষের পথে। রাস্তাও কখন যেন বেশ খাড়া হয়ে গেছে। এখন রীতিমত বেশ খাড়া। আর তখন আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম, কারণ এটা অন্তত জানতাম যে,খাড়া পাহাড়ে ওঠা যত না কষ্টের নামা তার চেয়ে ঢের কষ্টের।
এরকম খাড়া পাহাড়ের সাথে যুদ্ধ করে কিছুক্ষণ পরে যা হওয়ার তাই হল। আমার সহধর্মিণী বসেই পড়লেন রাস্তায়। তিনি আর যেতে পারছেন না। এর মধ্যে তিনি কাজের কাজ যেটা করলেন সেটা হচ্ছে, প্রচণ্ড গরমে যেটুকু খাওয়ার জলও অবশিষ্ট ছিল, তিনি সেটুকু মাথায় ঢেলে বসে পড়লেন। এদিকে ভাই আমার তরতর করে উঠে গেছেন আরও অনেক উপরে, তার টিকিটিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছেনা। আর আমি এদিকেও যেতে পারছিনা, ওদিকেও না।

উনি ক্লান্তিতে বসেই পরেছেন


বউ কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পরে বললাম, চলো নেমে যাই। তিনিও রাজী হলেন। ভাইকে ফোন দিয়ে বলবো নেমে আসতে, এমন সময়েই দেখি, আমরা আর নামতে পারছিনা। কারণ রাস্তা যে এত খাড়া, তা ওঠার সময় বুঝিনি……কিন্তু নামতে গিয়ে দেখলাম, এই খাড়া রাস্তা দিয়ে কোনভাবেই (অন্তত আমাদের পক্ষে) নামা সম্ভব নয়। হয় উপরে উঠতে হবে, নয় এখানে বসে থাকতে হবে, নয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে হবে।
“ছেড়ে দে মা নেমে বাঁচি”- কিন্তু মা তো ছাড়বেন না। তাই সাহস সঞ্চয় করে ভাবলাম উঠবো। চেষ্টা করি আর একটু। বউ বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। তাকে ধরে ধরে উঠাচ্ছি, আবার রাস্তা একটু কম খাড়া হলে নিজে নিজেই উঠছে। এভাবে একটু একটু করে উঠছি। আর আমি মনে মনে খুঁজছি নামার অন্য কোন রাস্তা আছে কিনা! নির্জন গা ছমছমে পাহাড় বেয়ে উঠছি আর ভাবছি ‘এডভেঞ্চার এ কতই না মধু- আহা!’।
হাটি হাটি পা পা করে উঠছি। রেস্ট নিচ্ছি আবার উঠছি। গতিবেগের অবস্থা খারাপ। এ দিক দিয়ে নামার এর কোন চান্স নেই এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি আমি। তবে এই ধাক্কায় বেশ অনেকটা পথ আস্তে আস্তে হলেও পেরিয়ে এসেছি।
আরও কিছুক্ষণ পর আর পারা গেলনা………আমার অর্ধাঙ্গিনী বমি করেই দিলেন। এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। কিছুটা অসহায় লাগছিলো তখন। একটু পাশে তাকিয়ে দেখলাম, পাহাড় গিয়ে সমতলে মিশেছে, সমতল মিশেছে সমুদ্রে আর সমুদ্র মিশেছে দিগন্তে। সে এক দেখার মত দৃশ্য। দেখে পাগল হয়ে যাওয়ার মত দৃশ্য। তবে সে দৃশ্য উপভোগের মত অবস্থা তখন ছিলোনা। এডভেঞ্চার ততক্ষণে ম্যাডভেঞ্চার এ পরিণত হয়েছে। আক্কেল সেলামী আরও কতটা কীভাবে দিতে হবে এই যখন ভাবছি তখন উপরে শব্দ পেলাম। মনে হচ্ছে কেউ যেন কিছু কাটছে- বড় ঘাস বা এই জাতীয় কিছু। নিচ থেকেই হাঁক দিলাম। সাড়াও পেলাম। মন্দির আর কতদূর জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেলাম, আর সামান্য একটু। দুজনেই যেন আত্মায় জল পেলাম। ওঠা শুরু করলাম আবার। কিছুটা উঠতেই সেই লোকের দেখা পেলাম, যিনি কিছু একটা কাটছিলেন। আমাদের দেখেই সহাস্যে বললেন এই একটু উপরেই মন্দির। ভালো করে কান পেতে উপরে যেন কথা বার্তার আওয়াজ পেলাম।তখন আমাদের শরীরে নতুন করে যেন শক্তি এলো। আবার একেবারে নিশ্চিন্তও হওয়া যাচ্ছিলোনা, কারণ নিচ থেকেই শুনে আসছি মন্দির অল্প একটু উপরে- উঠে যান। লোকাল লোকদের কাছে এই দূরত্তব অল্বেপ একটু কিন্তু আমাদের কাছে তো আর না! অবশ্য এবার তথ্য সঠিক ছিল। আরও একটু উঠেই দেখলাম চোখের সামনে বিরূপাক্ষ মন্দির দাঁড়িয়ে। আর আমার ভাই মন্দিরের পুরোহিতের সাথে গল্প করছে- সেই আওয়াজই নীচ থেকে পাচ্ছিলাম।মন্দিরের সামনে ঠাণ্ডা জল, স্যালাইন বানানো রাখা। খেয়ে যেন নতুন জীবন পেলাম দুজনেই। একটা স্বর্গীয় পরিবেশ-আশ্চর্য শান্ত সৌম্য পরিবেশ। হু হু করে হাওয়া বইছে। মনে হচ্ছিলো, এর চেয়ে শান্তির যায়গায় জীবনে যাইনি।চার দিকের দৃশ্য আর বললাম না। একসাথে চোখের শান্তি, দেহের শান্তি আর মনের শান্তির এরকম মিশেল জীবনে আর পেয়েছি বলে আসলেই মনে হয়না।জানিনা খুব ক্লান্ত ছিলাম বলেই কিনা, বা প্রচণ্ড ডিহাইড্রেশনের পরে ঠাণ্ডা জল আর এত কোমল বাতাস পেয়েছিলাম বলেই বা কিনা, যেন মনে হল এ এক নতুন জীবন। এ এক অন্য পৃথিবী। এখানে একটা জনম কাটিয়ে দেয়া যায়, ওই দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে।

বিরূপাক্ষ মন্দির
মন্দির
এই বেল গাছে ভক্তরা কোন কিছু কামনা করে সুতো বেঁধে রেখে যায়, যাতে তাদের কামনা পূরণ হয়


বিরূপাক্ষ মন্দিরে পাশাপাশি দুটো মন্দির। এক মন্দিরের পুরোহিত লম্বাটে পেটানো শরীর। আরেক মন্দিরের পুরোহিত বয়স্ক, দাঁড়ি আছে। পূজো দেয়া হল দুটো মন্দিরেই।প্রসাদের ফল কিছু খাওয়া হল, আর একটা আম পথের জন্য নিয়ে নিলাম। কারণ এখনো আসল চন্দ্রনাথ মন্দিরেই যাওয়া হয়নি। সেটা পাহাড়ের উপর দিয়ে আরও কিলো দেড়েক হবে হয়তো। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে হাজার খানেক ফিট উচ্চতায় উঠেও এক প্রশান্তি আমাদের ঘিরে রেখেছিলো, তখন মনে হচ্ছিলো, যদি মাঝ পথে নেমে যেতে পারতাম (তাহলে অবশ্যই নামতাম), কিন্তু এই অনুভূতির সাথে জীবনে হয়তো কখনোই পরিচিত হতে পারতাম না। এখানকার পর্ব শেষ করে আসল চন্দ্রনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। এবার সাথে কয়েকজন লোক পেলাম, যারাও যাচ্ছে ওইদিকে।
আমরা অবশ্য ওই লোকদের সাথে তাল মিলাতে পারলাম না। আমরা আস্তে আস্তে আগাতে লাগলাম। মাঝে মধ্যে ছবি তোলা, দুষ্টামি করা চলছিলো। ক্লান্তিটা তখন ফিকে হলেও আছে, সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। এই রাস্তাটা খুব একটা খারাপ না। অত উঁচু নিচুও না। জাস্ট পাহাড়ের উপর দিয়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার মত ব্যাপার। যেতে যেতে একটা দোকান পেলাম প্রায় মাঝপথে এসে। সে দোকানে সব কিছুর দাম দিগুণ, তিনগুন। তারপরেও পাহারের এই উচ্চতায় জিনিস এনে বিক্রি করা- দাম বেশি নেবে সেটা অস্বাভাবিকও নয়।সেখানে কিছু বিস্কিট জাতীয় জিনিস খেলাম। আর খেলাম বাতাস। একপাশে বাঁশের/ কাঠের তৈরি বড় বড় বেঞ্চ পাতা আছে। তাতে বসলে বাতাস প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ শুয়েও থাকলাম সেখানে।

দোকান থেকে ভিউ


একটু পরেই পৌঁছে গেলাম চন্দ্রনাথ মন্দিরে। ছোট্ট সুন্দর একটা মন্দির। পুরোহিত বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। আরও কয়েকজন দর্শনার্থী ছিল অবশ্য। সব মিলিয়ে আমরা গোটা দশেক ছিলাম মন্দিরে।মন্দিরের পাঠ চুকিয়ে বাইরে বের হলাম। এবার নামার পালা। মন্দিরের সামনে দিয়েই সিঁড়ি করা আছে একেবারে নিচ পর্যন্ত। ওঠার সময় যে ঝর্নার কাছ দিয়ে আমরা বায়ে উঠেছিলাম, এই সিঁড়ি সেখানের ডান দিকে। আমরা এই সিঁড়ি দিয়ে উঠলে চন্দ্রনাথ মন্দির দেখেই আবার নেমে যেতে হতো। কারণ অন্য পথ দিয়ে উঠেছি ঠিকই, কিন্তু নামতে পারতাম না। যাই হোক, এই সিঁড়িগুলো বেশ বড় বড় স্টেপের। উচ্চতা বেশ বড় মনে হল। একেক ধাপ নামছি আর পা টন টন করে উঠছে। মনে হচ্ছে, সারা শরীরের ওজন যেন একটা পায়ের উপরেই পরছে। তার মধ্যে তখন শেষ বিকেল। কোথাও বন, কোথাও পাথুরে দেয়াল, কোথাও সুড়ঙ্গ হয়ে নামতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে পাখির কর্কশ ডাক বা অন্ধকার ছোট্ট সুড়ঙ্গে তক্ষকের ডাক- কিছুটা ভয় পাইয়ে দেয়। নামছি আর নামছি। আর দূরে দেখছি সেই রাস্তা যেটা দিয়ে আমরা উঠেছি। বিশ্বাসই হয়না, আমরা যারা গত দশ বছরেও মনে হয় একটা বড় টিলাতেও উঠিনাই, আমরা এমন রাস্তা দিয়ে অত উপরে উঠেছি।

চন্দ্রনাথ মন্দির
এই পথ দিয়েই নামতে হবে আমাদের


একটা সময় সেই ঝর্নার সামনে নেমে আসলাম। মানে আমরা নীচে পৌঁছে গেছি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেটে এগুচ্ছি। সন্ধ্যে হয়ে এলো প্রায়। দেখি আমাদের লাঠি নেয়ার জন্যে দোকানি দাঁড়িয়ে আছে। দোকান বন্ধ করে ফেলেছে, শুধু আমাদের জন্যেই ওয়েট করছিলো। লাঠি ফিরিয়ে দিলাম। প্যাঁচানো পথ ধরে নেমে আসলাম পাহাড়ের একেবারে গোঁড়ায়। ততক্ষণে মাগরিবের আজান পরে গেল।
সীতাকুণ্ড বাজারে এসে একটা মিনিবাস টাইপ জিনিসে উঠে বসে রইলাম। এগুলো চট্টগ্রাম যায়। এখন ইফতারীর সময়। ইফতারী করে পর্যাপ্ত লোক হলেই ছাড়বে বাস।
বাস ছেড়েছে কিছুক্ষণ আগেই। বোধহয় একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম বাসের সীটে হেলান দিয়ে। পা ব্যাথায় টনটন করছে। মাইগ্রেনের ব্যথাটাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ক্লান্তির কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু এর পরেও, কাল বা খুব বেশি হলে পরশু এই ব্যথা আর থাকবেনা, কিন্তু হুট করে যেভাবে চন্দ্রনাথ ঘুরে এলাম, সেই স্মৃতি চাইলেও তো আমরা ভুলতে পারবোনা।

এ অভিজ্ঞতা এক দারুন সঞ্চয় হয়ে থাকবে জীবনে।

আগুন লেগেছে শহুরে রাতের গায়ে!


20150618_210856

অন্ধের দেশের চশমা বিক্রেতা।


ignorance-quotes-hd-wallpaper-10

বাংলাদেশের টকশো এবং চায়ের দোকান থেকে প্রাপ্ত হিসেব মতে এদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বুদ্ধিজীবী। কিন্তু আয়রনিটা হচ্ছে এই বুদ্ধির বাজারের বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়েই ‘মোটামুটি’ বুদ্ধিহীন।’মোটামুটি’ বলার কারন হচ্ছে, মাছ বাজারে মাছ বিক্রেতা কত দাম চাইলে কত থেকে দাম বলা শুরু করলে ঠকার সম্ভাবনা কম, সেই জ্ঞানটুকু এদের আছে। তো এই বুদ্ধির বাজারের অবস্থা হচ্ছে সেই কৌতুকটার মত- এক অশিক্ষিত লোক চিঠি লিখছে দেখে আরেকজন জিজ্ঞেস করছে, কীরে তুই কী চিঠি লিখছিস, তুই তো লিখতেই জানিসনা, তখন চিঠি লেখকের উত্তর, সমস্যা নেই, যাকে লিখছি সেও পড়তে জানেনা। মানে পুরাই কানার হাটবাজার অবস্থা আর কী!!

কিন্তু সেই অন্ধদের দেশে কেউ কেউ চশমা বিক্রি করতে আসেন। এসে করুণ পরিনতিও ভোগ করেন। এটা আসলে চশমা বিক্রেতারই দোষ। চোখ খারাপ হলে তাকে চশমা দিয়ে দেখানো যায়, যার চোখই নেই, যে অন্ধ তাকে চশমা দিতে আসা কেন বাপু! বড়জোর কালো সানগ্লাস দিয়ে চোখদুটি ঢেকে দিতে পারতে, যাতে অন্ধত্বটা সহজে বোঝা না যায়।

বিঃদ্রঃ এই লেখা যদি কারো কোন প্রকার অনুভূতিকে টান দিয়ে শুইয়ে ফেলে তা লেখকের অজ্ঞতাপ্রসূত কাকতাল মাত্র। কাক যেহেতু বসেই পড়েছে আর তাতে তাল যেহেতু পড়েই গেছে, কী আর করবেন, বাড়িতে নিয়ে যান, গুলিয়ে পিঠা বানিয়ে খান। তালের পিঠা দারুণ টেস্টি জিনি্‌ বিলিভ মি।

আমার ইচ্ছে করেঃ নচিকেতার গান।


Nachiketa

আমার ইচ্ছে করে আকাশ  বাড়ির ছাদ

ভেঙ্গে বৃষ্টি আসুক ভাসুক অবষাদ

আমার ইচ্ছে করে হাতের পাচিল দিয়ে

তোকে জড়িয়ে থাকি সকাল থেকে রাত

আমার ইচ্ছে করে সকাল চাদর হয়ে

রাতের কালো জাপটে ধরে রাখি

আমার ইচ্ছে করে বিধানসভায় গিয়ে

দেয়ালে অপুষ্টির ছবি আঁকি

আমার ইচ্ছে করে তুই যখন অসহায়

গোটা দূনিয়াটাকে বলি মূর্দাবাদ

আমার ইচ্ছে করে হাতের পাচিল দিয়ে

তোকে জড়িয়ে থাকি সকাল থেকে রাত

আমার ইচ্ছে করে শীতবেড়ালের মত

কুঁকড়ে শুয়ে থাকিরে তোর কোলে

আমার ইচ্ছে করে সিদ্ধ নগর গড়ি

এই শহরের নিষিদ্ধ অঞ্চলে

আমার ইচ্ছে করে বলি করে চীতকার

আমার বকলেসহীন জীবন জিন্দাবাদ

আমার ইচ্ছে করে হাতের পাচিল দিয়ে

তোকে জড়িয়ে থাকি সকাল থেকে রাত

প্রতিদিন ভেবে যাই মৃত্যু আসুকঃ নচিকেতার গান।


 Nachiketa

প্রতিদিন ভেবে যাই মৃত্যু আসুক
মৃত্যু কী আসলে তোমার মত
আসলে তো মৃত্যুকে চাইনা সেভাবে
তোমাকেও চাই ঠিক মৃত্যুর মত

প্রতিদিন ভেবে যাই বৃষ্টি আসুক
ভেসে যাক সব নাগরিক দায়ভার
আসলে কী বৃষ্টিকে চাই সেভাবে
জীবনতো আসলে দুইয়ে দুইয়ে চার
আসলে তো বৃষ্টিকে চাইনা সেভাবে
তোমাকেও চাই ঠিক বৃষ্টির মত

প্রতিদিন ভেবে যাই সন্ধ্যা আসুক
ডুবে যাক সব আবীলতা (?) আধারে
আসলে কী সন্ধ্যাকে চাই সেভাবে
জীবন যা আবিল চায় বারেবারে
আসলে তো সন্ধ্যাকে চাইনা সেভাবে
তোমাকেও চাই ঠিক সন্ধ্যার মত /

বাস্তবতা।


ImageImage

 

 

 

 

লঞ্চডুবি হয়, রুস্তম আর হামজা হেলতে দুলতে ঘটনাস্থলে যায়। ডুবুরিরা পানিতে ডুব দিয়ে লাশের পেট কেটে দেয়, যেন লাশগুলো ভেসে ঊঠেও আত্মীয়-স্বজন এর হাতে সমাহিত হতে না পারে।

দালান হেলে পরে, রাজউক লিস্ট করে ঝুঁকিপূর্ণ দালানের। লিস্ট নিয়ে স্যারেরা দালানের মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে চীত হয়ে শুয়ে থাকেন। এরপর দালান বিধ্বস্ত হয়। কিছু মানুষ জীবন বাজী রেখে উদ্ধার কাজে সহায়তা করে, আর কিছু মানুষ তামাশা দ্যাখে। আধুনিক কোন যন্ত্রপাতি নাই, যে দ্রূত আটকে পড়াদের উদ্ধার করা যাবে।

আমাদের আসলে কিছুই নেই, দুইটা জিনিস ছাড়া।

১> কিছু উতসুক জনতা 
২> কিছু উজবুক নেতা।

রুমান'স ব্লগ

যেখানে পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ সম বিস্তৃত

নিরন্তর

কান পেতে শুনি গগনে গগনে নীরবের কানাকানি।

Quamrul Abedin

Observations & Absorptions

দেখা যাক চিন্তার দৌড় কদ্দুর...

নৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে ভাবনা-চিন্তার খাতা। রাষ্ট্র মানে কি লেফ-রাইট? চিন্তা মানে কি প্রশ্ন তোলা? এইগুলো নিয়ে বাচ-বিচার হোক এবার

একজন সাদামাটা গল্পকার

গালগল্প করিয়াই জীবনখানা কাটিয়া যাইতেছে

সুস্বাদু সব বাংলা খাবার

বাংলায় লেখা রেসিপি - জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Krishprov's Weblog

Just another WordPress.com weblog

iambuppy

Just another WordPress.com site

বাংলা ব্লগ ৭১

সৃষ্টি সুখের উল্লাসে . . . . .

saroarmamun

Just another WordPress.com site

তির্যকের ব্লগ

ভিন্ন চোখে অন্য আলো

Get Anything You Want Here

Just another WordPress.com site

দুষ্ট ব্লগ

যে কথা মুখে হয়নি বলা ...

অবিবেচক সমগ্র

সবাইকে অবিবেচক সমগ্রে সু-স্বাগতম

%d bloggers like this: